একটি কাকের আত্মকথা
আমার জন্মের কথা আমার মনে নেই। তবে মা বলত, সেদিন নাকি আকাশ খুব নীল ছিল। চারদিকে স্নিগ্ধ শীতল বাতাস বইছিল।
তখনও আমি উড়তে শিখিনি। আমার বাসাটা ছিল পুরোনো এক কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে। উঁচু ডালের সে বাসা থেকে ওই বিস্তীর্ণ নীল আকাশ দেখতে আমার খুব ভালো লাগতো। মা বলত, “দেখিস, একদিন তুইও এই আকাশের মতোই বড় হবি।” কিন্তু আমি তখন জানতাম না, আকাশ সবার জন্য সমান হলেও পৃথিবীটা সবার জন্য সমান নয়।
কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালে আরও অনেক পাখির বাসা ছিল। চারপাশে কত পাখি! কারও গায়ে নীলের ছোঁয়া, কারও ডানায় সাদা-কালোর মায়া, কারও বুক যেন সকালের রোদের মতো হলুদ। তাদের দেখলে মানুষ থেমে যেত। কেউ খাবার ছুড়ে দিত, কেউ ছবি তুলত, কেউ মুগ্ধ হয়ে বলত, “বাহ্! কী সুন্দর!”
আমি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখতাম। আমারও খুব ইচ্ছে হতো আমাকে দেখেও কেউ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবে, খাবার ছুঁড়ে দিবে খেতে। তারপর একদিন সাহস করে আমিও মানুষের কাছে নেমে এলাম। ঠিক তখনই একটি ছোট্ট মেয়ে আমাকে দেখে চিৎকার করে উঠল, “মা! দেখো একটা কুৎসিত কাক! তাড়াও, তাড়াও!”
তার মা হাত নেড়ে আমাকে তাড়িয়ে দিলেন। আমি ভয় পেয়ে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম। খুব অবাক হলাম। আমাকে তাড়িয়ে দিল কেনো? আমি কি কিছু করেছিলাম? আমাকে কেনো কুৎসিত বললো?
পরদিন আবার গেলাম। এবার একজন বৃদ্ধ লাঠি তুলে বললেন, “হুশ! হুশ!” আমি আবারও ভয় পেয়ে উড়ে গেলাম। প্রতিনিয়ত এমন ঘটনা ঘটতে লাগলো আমার সাথে।
একদিন আমি খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। এক গৃহস্থ বাড়ির চালে দাঁড়িয়ে দেখলাম, কয়েকটা কবুতর উঠোনে নেমেছে। একজন বৃদ্ধা তাদের জন্য চাল ছড়িয়ে দিলেন। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম। প্রচণ্ড ক্ষুধার তাড়নায় এগিয়ে যাচ্ছিলাম। বৃদ্ধা আমাকে দেখেই হাত নাড়লেন, “হুশ! হুশ! দূর হ! অশুভ কাক এসেছে!”
আমি সরে গেলাম। কিছুক্ষণ পর একটা সাদা কবুতর ঠিক সেই জায়গায় এসে দাঁড়াল। বৃদ্ধা আবার চাল ছড়িয়ে দিলেন। আমি তাকিয়ে রইলাম। সেদিন প্রথমবার বুঝলাম যে, ক্ষুধারও বুঝি রং হয়। তারপর থেকে বুঝে গেলাম, মানুষের কাছে আমার জন্য কোনো জায়গা নেই।
সাদা পাখিগুলো মানুষের বারান্দায় বসে খাবার খায়। রঙিন পাখিগুলো খাঁচায় থেকেও ভালোবাসা পায়। আর আমি? আমি একটু কাছে গেলেই পাথর ছোড়া হয়। আমার কালো পালক দেখে কেউ মুখ বাঁকায়। কেউ বলে, কাক নাকি অশুভ। কেউ বলে, কাক মানেই নোংরা। কেউ আবার আমাকে দেখেই এমন ভাবে তাড়িয়ে দেয়, যেন আমার জন্মটাই একটা অপরাধ।
আমি তখন ছোট ছিলাম। তাই একদিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “মা, আমরা কি সত্যিই খারাপ? আমরা কি সত্যিই অশুভ?”
মা কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর আমার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বলেছিল, “না রে। তুই খারাপ না। তুই শুধু কাক হয়ে জন্মেছিস।”
আমি তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তাহলে সবাই আমাকে পছন্দ করে না কেন? কেনো আমি কাছে গেলেই আমাকে সবাই তাড়িয়ে দেয়? আমাকে কুৎসিত বলে?”
সেদিন মা আর কোনো উত্তর দেয়নি। হয়তো তার কাছেও উত্তরটা অজানা ছিল। হয়তো সেও আমার মতো ছোট থেকেই সবসময় এমনটা হতে দেখছিল।
দিন যেতে লাগল। আমি বড় হলাম। কিন্তু মানুষের চোখে আমার কোনো পরিবর্তন হলো না। তাদের চোখে আমি শুধু একটা কালো কাক। কুৎসিত, অপছন্দের, অশুভ, অসুন্দর একটা কালো কাক। মানুষের কাছে আমার জন্য কোনো জায়গা নেই।
একদিন ভোরে দেখি, উঠোনে একটি ছোট্ট সাদা পাখি পড়ে আছে। তার একটি ডানা আহত। আমি কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর বাড়ির মানুষ ছুটে এল। “আহা! পাখিটা আহত হয়েছে!” কেউ তাকে পানি দিল, কেউ কাপড় আনল, কেউ তাকে হাতে তুলে নিল।
আমি শুধু দূর থেকে তাকিয়ে রইলাম। সেদিন আমার খুব ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে জিজ্ঞেস করি, “আমার ডানা ভাঙলে তোমরা কি এভাবেই ছুটে আসতে? এভাবে আমারও যত্ন নিতে?”
কিন্তু আমি কাক। আমার ডাক মানুষের কাছে কেবল কর্কশ শব্দ। তাই চুপ করে রইলাম।
মাঝে মাঝে আমার মনে হতো, হয়তো সত্যিই আমার মধ্যে কোনো দোষ আছে। হয়তো আমার জন্মটাই ভুল ছিল। হয়তো আমি যদি সাদা হতাম, কেউ আমাকে ভালোবাসত। যদি আমার ডানায় একটু রং থাকত, কেউ আমাকে দেখে হাসত। যদি আমি কাক না হয়ে অন্য কোনো পাখি হতাম? তাহলে কি আমার জীবনটা অন্যরকম হতো?
কয়েক বছর আমি আর মানুষের কাছে যাইনি। ক্ষুধা পেলে দূর থেকে খাবার কুড়িয়েছি। তৃষ্ণা পেলে নোংরা ড্রেনের পাশে পানি খেয়েছি। কেউ ভালোবাসবে এই আশাটুকুও একদিন ছেড়ে দিয়েছি।
শুধু একটা প্রশ্ন আমাকে ছাড়েনি। আমার অপরাধটা কী? কালো হয়ে জন্মানো? কাক হয়ে জন্মানো? নাকি মানুষের বানানো সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে না মেলা? আমি জানি না।
প্রায়ই রাতে একা বসে নিজের কালো পালকের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কতবার যে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে নিজেকেই ঘৃণা করেছি, তার হিসাব নেই।
আমি আয়নায় নিজেকে দেখিনি কোনোদিন। কারণ আমার আয়না ছিল মানুষের চোখ। আর সেই চোখগুলো প্রতিদিন আমাকে বলেছে, “তুমি সুন্দর নও। তুমি গ্রহণযোগ্য নও। তোমার রং কুৎসিত। তুমি কালো, তুমি অশুভ। তোমার অস্তিত্বটাই যেন একটা ভুল।”
তাই আমি শুধু আকাশে উড়ে যাই। আমার কুৎসিত কালো ডানায় ভর দিয়ে। সেই বিস্তীর্ণ নীল আকাশের নিচে। যে আকাশের দিকে তাকিয়ে একদিন আমার মা আমায় বলেছিল, “দেখিস, একদিন তুইও এই আকাশের মতোই বড় হবি।”
একদিন দুপুরে প্রচণ্ড গরমে আমি একটা বাড়ির কার্নিশে বসেছিলাম। নিচে এক মেয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার গায়ের রং নিয়ে কেউ কিছু বলছিল।
“মেয়েটা আরো কালো হয়ে গেছে না?” “রোদে এত ঘোরাঘুরি করলে তো এমন হবেই।” “অমন কালো মেয়ের বিয়ে কি এত সহজ?বিয়ের সময় সমস্যা হবে ।” মেয়েটা কিছু বলল না।শুধু আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি অনেকক্ষণ তাকে দেখেছিলাম। তারপর প্রথমবার মনে হলো, মানুষ শুধু কাককেই কালো বলে তাড়ায় না।
কিছুদিন পর মেয়েটাকে আর দেখিনি। শুনেছিলাম, বিয়ের জন্য তার গায়ে ফর্সা করার ক্রিম লাগানো হচ্ছে। আমি বুঝতে পারিনি, মানুষের কাছে ভালোবাসার জন্যও কি নিজের রং বদলাতে হয়? আমার তো বদলানোর মতো কিছু ছিল না। আমার পালক যদি সাদা করে দিতাম! কীভাবে দিতাম? আমি তো কাক।
তবে সেদিন থেকে একটা কথা বুঝেছি। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর অন্ধকার রাতের আধারে নেই। আছে মানুষের চোখে। কারণ সেই চোখ কখনো কখনো একজন মানুষকে তার মনের জন্য নয়, তার গায়ের রঙের জন্য বিচার করে। কখনো তার মুখের সৌন্দর্যের জন্য। কখনো তার জন্মের জন্য। কখনো শুধু এই কারণে যে সে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতো দেখতে নয়।
মানুষ যদি সত্যিই সৌন্দর্য ভালোবাসে, তবে তারা কেন সৌন্দর্যের সংজ্ঞা এত ছোট করে বানিয়েছে? কেন কালো মানেই কুৎসিত? কালো মানেই কেনো অশুভ? কেন ফর্সা মানেই সুন্দর?
কেন সুন্দর আর ফর্সা না হলেই মানুষটা কুৎসিত মানুষ হয়ে যায়? কেন জন্মের সময় কেউ নিজের রং বেছে নিতে না পারলেও, সারাজীবন সেই রঙের জন্য তাকে ক্ষমা চাইতে হয়? এর কোনো উত্তর আমার জানা নেই। আমি তো শুধু একটা কাক। কিন্তু মানুষ তো মানুষ।
তবু আজও কোথাও কোনো মেয়ে হয়তো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গায়ের রং নিয়ে কাঁদে। কোনো ছেলে বন্ধুর হাসির আড়ালে নিজের চেহারা লুকায়। কোনো মা তার সন্তানকে কড়া শাসনের সুরে বলে, “রোদে যাস না, কালো হয়ে যাবি।” কোনো বিয়েতে হয়তো ফর্সা মেয়েটির প্রশংসা হয়, আর কালো মেয়েটির জন্য বলা হয়, “মেয়েটা মন্দ না, কিন্তু রংটা একটু…”
তারা কেউ কাউকে পাথর ছুড়ে মারে না। কেউ “হুশ” বলে তাড়ায় না। তবু মানুষ প্রতিদিন মানুষকে একটু একটু করে তাড়িয়ে দেয় তার নিজের আয়না থেকে, তার নিজের আত্মবিশ্বাস থেকে।
আর সে তখন আমার মতোই একদিন নিজের প্রতিবিম্বের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে, “আমার দোষটা কী? কালো হয়ে জন্মানো? নাকি মানুষের বানানো সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে না মেলা?”
আজ আমি বুড়ো। আমার ডানা আর আগের মতো শক্ত নয়। আমি আর এখন মানুষের কাছে যাই না। উঁচু সুরে গান করি না। কারণ আমি কালো, কুৎসিত কাক। আমি অশুভ, আমার কণ্ঠ কর্কশ।
আমি জানি না পৃথিবী কোনোদিন আমার মতো কাককে সুন্দর বলবে কি না। তবে যদি কোনোদিন কোনো শিশু আমাকে দেখে ঢিল না তুলে শুধু একটু খাবার বাড়িয়ে দেয়, সেদিন হয়তো আমি বিশ্বাস করব যে, আমার জন্মটা ভুল ছিল না। ভুল ছিল শুধু সেই চোখগুলোতে।
যারা আমাকে দেখেছিল কাক হিসেবে নয়, শুধু কালো আর কুৎসিত বলে।
