বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

“সমালোচনা” যখন আলোচনার বিষয়

Author

মুহাম্মাদ যায়েদ আব্দুল্লাহ , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৩ বার

“সমালোচনা” নিয়ে আজ আমাদের সমাজে চলছে ব্যাপক সমালোচনা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় সবার হাতেই এখন স্মার্টফোন। স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার অবদানে যেন দেশের সকল নাগরিকই এখন সমালোচক হয়ে গিয়েছেন। এখানে, সমালোচনা করা বা সমালোচক হওয়াটা দোষের বিষয় না, সমস্যাটা দেখা দেয় সমালোচনার ক্ষেত্রে ভাষার বিকৃত ব্যবহারে। দুঃখজনকভাবে,  এ সমস্যাটিই মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে, সমালোচনার ক্ষেত্রে অশ্লীল ভাষার ব্যবহার, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পারিবারিক এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার মতো নিন্দনীয় কাজগুলো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। সমালোচক একটিবারও হয়তো ভাবেন না যে, তার সমালোচনামূলক কটু কথা অপরপাশের ব্যক্তির মানসিক, সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনে কতটুকু প্রভাব ফেলতে পারেক কীংবা কী পরিমাণ মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে সেই ব্যক্তিটি। এই অসামাজিক কাজ অধিকাংশই ঘটছে ইন্টারনেটে। কারণ, সেখানে সরাসরি জবাবদিহি নিশ্চিত করা বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রশ্নের মুখোমুখি করার কার্যকর কোনো উপায় থাকে না। নেই তার পরিবার বা সমাজকে এ বিষয়ে অবগত করার কোনো মাধ্যমও।  ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, এই মহামারীতে এখন লিঙ্গ ও বয়সভেদে সকল বয়সের জনগণ জড়িত। হোক সে মিলেনিয়াল অথবা জেন-জি।

সমাজের ভারসাম্য রক্ষায় সমালোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সমালোচনা হতে পারে নেতৃস্থানীয় কারো কাজে, সরকারি কোনো সিদ্ধান্তে অথবা ব্যক্তিগত দোষ-ত্রুটি নিয়ে। কেননা, যে সমাজ বা রাষ্ট্রে সমালোচনা নেই, সেখানে জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি রয়েছে। সমালোচনাহীন পরিবেশে দায়সারা ও অপরাধমূলক  কাজের উপস্থিতি থাকবেই। ভারসাম্য ও দায়িত্বশীল সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে প্রশ্নবিদ্ধ করার অধিকার নৈতিক দায়িত্ব তো বটেই, একটি অপরিহার্য বিষয়ও। যখন একজন ব্যক্তি বা দায়িত্বশীল সমালোচনার মুখোমুখি হন, তখন পূর্বের তুলনায় তার দায়িত্ব পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ও পূর্ণতা দেখা যায়।

সমালোচনা হতে পারে বিভিন্ন ধরনের- গঠনমূলক, ইতিবাচক-নেতিবাচক, যৌক্তিক কিংবা নৈতিক। কিন্তু, আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ধ্বংসাত্মক ও পরহিংসামূলক সমালোচনা। এ ধরনের সমালোচকরা ব্যক্তির কাজ কিংবা পেশার কোনো মূল্যায়ন করেন না। তাদের সমালোচনার বিষয়বস্তু হয় ব্যক্তির দল, আদর্শ ও জেন্ডার দেখে। ব্যক্তি যদি সমাজ ও জাতির জন্য অজস্র সামাজিক ও পরোপকারমূলক কাজ করেও থাকেন, তবুও, দিনশেষে মত ও আদর্শের বিপরীতে অবস্থান করায় সমালোচনার বিষাক্ত তীরে আক্রান্ত হতে হয়। অথচ, আমাদের আদি ইতিহাস ঘাটলে এমন ঘটনার দেখা পাওয়া মুশকিল।

 আমাদের অগ্রজদের ইতিহাসে গঠনমূলক সমালোচনার ব্যাপক উদাহরণ পাওয়া যায়। যেমন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও বঙ্কিমচন্দ্রের নৈতিক সমালোচনা কিংবা আইনস্টাইন এবং বৈজ্ঞানিক নিলস বোরের বৈজ্ঞানিক সমালোচনা, অথবা ডি টকভিলের রাজনৈতিক সমালোচনা – সবই ছিল গঠনমূলক ও তাত্ত্বিক। তাদের সমালোচনায় অশ্রব্য ভাষার ব্যবহার বা অন্যকে নীচ দেখাতে কোনো শব্দের ব্যবহার দেখা যায়নি।  পরিবার বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক কোনো আক্রমণও করতেন না তাঁরা। বিপরীতে, আজ আমাদের সমাজে সমালোচনার সংজ্ঞাই যেন বদলে গিয়েছে। এখন সমালোচনার মানদণ্ড হচ্ছে- একপক্ষ অপরপক্ষকে কতটা হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে অথবা কে কতটা অশ্লীল ভাষা ব্যবহারে পারদর্শী ।

প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় সমালোচনা একটি নাগরিক অধিকার। গঠনমূলক সমালোচনার উপস্থিতিই প্রমাণ করে একটি রাষ্ট্রের সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক চর্চা। সমাজ বা রাষ্ট্রের নেতৃত্বে যারা থাকেন, তাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা হলে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, কুসংস্কার ও সামাজিক ভুল প্রথার বিরুদ্ধে সমালোচনা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারার জন্ম দেয় এবং সমাজ অগ্রগতির পথিক হিসেবে কাজ করে। একটি সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকরা যখন ক্ষমতাধরদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করায় না, তখন সেটি আর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার আওতায় পড়ে না। তখন তা ফ্যাসিস্ট বা একনায়কতন্ত্র গড়ার কারখানা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, ফ্যাসিজম ও ফ্যাসিস্টের উত্থান হয় সমালোচনা ও সমালোচকদের অনুপস্থিতি অথবা তাদের নিষ্পেষিত করার মাধ্যমে।

সুতরাং,  একথা বলাই যায় যে, সমালোচনা আমাদের ব্যক্তি, সামাজিক ও রাষ্ট্রজীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। আদিকাল থেকে আজ অবধি এর উপস্থিতি ছিল, আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে, ভাববার বিষয় হচ্ছে, বর্তমান সমাজে গড়ে ওঠা এর বিকৃত রূপ নিয়ে। সামাজিক অবক্ষয় রোধে এর প্রতিরোধ ও দমন করা এখন আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ এর সমাধান নিশ্চিত করে সুস্থ ও প্রকৃত রূপ ফিরিয়ে না আনলে ভবিষ্যৎ জেনারেশন সমালোচনার সর্বোচ্চ বিকৃত পর্যায়ে পৌঁছে যাবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই। এজন্য প্রয়োজন, পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় এর সঠিক ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করা। সমালোচনার ক্ষেত্রেও যে ভাষার সঠিক ব্যবহার প্রয়োজন এবং এক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা অপরাধ, এই বোধটুকু সন্তান ও শিক্ষার্থীসহ সকল নাগরিকদের মধ্যে জাগ্রত করা সর্বস্তরের অভিভাবকদের একান্ত দায়িত্ব। শুধু অফলাইনে নয়, অনলাইনেও সন্তানদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা অভিভাবকদের দায়িত্বসীমায় আনা দরকার। কারণ, এ ধরনের অপরাধ বর্তমানে অনলাইনেই বেশি সংঘটিত হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত ব্যক্তি বা পারিবারিক ভাষাগত আক্রমণ রোধে রাজনৈতিক দলগুলোকেও সক্রিয় দায়িত্ব পালন করা এখন সময়ের দাবি।

উইনস্টন চার্চিল বলেছিলেন, “সমালোচনা হচ্ছে শারীরিক ব্যথার মতো। ব্যথা যেমন শরীরের রোগের সংকেত দেয়, সমালোচনাও তেমনি সমাজ বা কর্মের অপরাধের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে।” সুতরাং, সমালোচনার ধারা অব্যাহত থাকুক। তবে, তা যেন হয়- গঠনমূলক, নৈতিক ও ইতিবাচক।

লেখক: সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।