মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কানেক্টেড থাকুন:
Logo
লগইন করুন নিবন্ধন করুন

শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আমাদের করণীয়

Author

মোঃ সিফাতুল্লাহ তাসনীম , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পাঠ: ৮৯ বার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত বছরের পুরনো দেয়াল অনেক কিছুর স্বাক্ষী। এই বিশ্ববিদ্যালয় একদিকে যেমন ন্যায়পন্থী বিভিন্ন আন্দোলন ও মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেই সংঘটিত বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় রয়েছে বিচারহীনতার কালো ইতিহাস। সেই নির্মম বাস্তবতায় আজও বিচারের অপেক্ষায় আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর পরিবার ও সহপাঠীরা।

২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্যার এ এফ রহমান হলে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে নিহত হন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু বকর সিদ্দিক। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ার পর মামলায় অভিযুক্ত দশ জনই খালাস পান। যে সংঘর্ষে একজন শিক্ষার্থী মারা গেলেন, সেখানে হত্যাকারীকে শনাক্ত করা গেল না কেন? এমনকি রাষ্ট্রপক্ষ সেই খালাসের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল পর্যন্ত করেনি মর্মে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস এলাকায় নিহত হলেন, মামলা হলো, বিচার হলো; কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘হত্যাকারী কে?’ সেটিই প্রমাণ করা গেলো না! গত ২০২৫ সালেও আবু বকরের হত্যার মামলা নিয়ে পুনরায় আলাপ উঠেছিল। দেড় দশক পরও প্রশ্নটি আমাদের তাড়া করে ফিরেছে; কিন্তু এখন অব্দি মেলে নি এর যৌক্তিক উত্তর!

একইভাবে, ২০২৫ সালের ১৩ মে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য টিএসসির নিকটস্থ সোহরাওয়ার্দি উদ্যান এলাকায় ছুরিকাঘাতে নিহত হবার ঘটনায় আজও সুষ্ঠু বিচার পায়নি খুনের শিকার হওয়া সাম্য, তাঁর পরিবার ও সহপাঠীরা। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার কথা জানায়। প্রাথমিক পর্যায়ে এমনকি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচারের কথাও বলা হয়েছিল, কিন্তু আজও তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত হয় নি।

এই যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি— এর নেপথ্যের কারণ কী? একটি হত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া অপরাধীদেরকে আরেকটা হত্যার পথ সহজ করে দেয়। এরূপ হত্যার শিকার কেবল আবু বকর বা সাম্য নয়, আরও অনেক মেধাবী মুখ। ক্যাম্পাসে ক্ষমতার রাজনীতির অপচর্চা বিচারকে প্রভাবিত করেছে বহুবার। নৈতিক মূল্যবোধ আর সততার শিক্ষা দেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার নিজস্ব শিক্ষার্থীদেরই হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে পারে নি, এর চেয়ে জঘন্য ও কলঙ্কজনক আর কোনো অধ্যায় ঢাবির ইতিহাসে আছে বলে মনে হয় না। বিভিন্ন হত্যার ঘটনায় অপরাধীর পেছনে প্রভাবশালী মহল জড়িত থাকায় বিচারের আলাপ দমিয়ে দেওয়া হয়েছে অথবা আইনি জটিলতা তৈরি করে দীর্ঘসূত্রিতা করা হয়েছে। একেকটি হত্যার ঘটনার পর শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়, প্রতিবাদ জানায়, অতঃপর নানান ইস্যুর ভিড়ে চাপা পড়ে যায় বিচারের দাবি।

তাহলে করণীয় কী? কীভাবে এই কলঙ্কজনক অধ্যায়ের অবসান হতে পারে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবু বকর ও সাম্য হত্যার মতো প্রতিটি ঝুলে থাকা হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়। এটি তৈরি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার, তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং সর্বোপরি, সময়ের সঙ্গে বিচার প্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের স্মৃতি থেকে ঘটনাগুলো হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে। তাই এর প্রতিকারও হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক, ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান মাধ্যমে।

প্রথমত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সকল হত্যাকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ নথি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। ক্যাম্পাসের নিহত শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ডেটা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ‘আর্কাইভ’ তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে শুধু নিহত শিক্ষার্থীর ছবি কিংবা স্মৃতিচারণই থাকবে না; বরং মামলার নম্বর, তদন্তের অবস্থা, চার্জশিট, বিচারিক অগ্রগতি, আসামিদের বর্তমান অবস্থা এবং মামলাটি কোথায় আটকে আছে— এসবের পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। অর্থাৎ পুরো বিচারিক প্রক্রিয়া ও এর অগ্রগতি শিক্ষার্থীসহ সকলের কাছে দৃশ্যমান করতে হবে, যাতে আইনের ফাঁক-ফোকরে কিংবা দীর্ঘসূত্রিতায় কোনো অপরাধী পার পেয়ে যেতে না পারে।

দ্বিতীয়ত, বিচার শুধু ভূক্তভোগী পরিবারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে বিচারাধীন প্রতিটি মামলার অগ্রগতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক দায়িত্ব নিয়ে নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একজন শিক্ষার্থীকে হারানোর পর তার পরিবারকে যেন একাই বছরের পর বছর আদালত, তদন্তকারী সংস্থা এবং প্রশাসনিক জটিলতার মধ্য দিয়ে যেতে না হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ডাকসু, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি এবং প্রয়োজনে আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি স্বাধীন সেল গঠন করা যেতে পারে। এই সেল কোনো বিচারিক সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করবে না; বরং সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে নির্দিষ্ট সময় পরপর তা শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলের সামনে তুলে ধরবে।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যে কোনো মূল্যে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হতে হবে। অপরাধী কোনো দলের, কোনো সংগঠনের কিংবা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ— এই পরিচয় যেন তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ না করে। অপরাধীর পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী মহলের সাথে তার সম্পৃক্ততা নয়, অপরাধই হতে হবে বিচারের কেন্দ্রবিন্দু। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় যদি একজন অপরাধীকে আইনের নাগালের বাইরে নিয়ে যায়, তাহলে সেটি আর রাজনীতি থাকে না; সেটি হয়ে যায় শোষণের হাতিয়ার।

চতুর্থত, বিচার প্রত্যাশী সচেতন শিক্ষার্থীদের মধ্যেও বিচার দাবির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের লেখালেখি, আলাপ, সভা-সেমিনার, পাঠচক্রে নিহতদের বিচারের দাবি জীবন্ত রাখতে হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত এখানেই। একটি হত্যাকাণ্ডের পর আমরা সোচ্চার হই, মিছিল করি, প্রতিবাদ করি। কিন্তু কয়েক মাস কিংবা কয়েক বছর পর যখন নতুন কোনো ঘটনা সামনে আসে, তখন পুরোনো মামলাটি আমাদের আলোচনার বাইরে চলে যায়। এভাবে বিচারহীনতা দীর্ঘায়িত হয়। নিহতদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করা শিক্ষার্থী, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সকলেরই দায়িত্ব।

পাশাপাশি, নতুন করে যাতে আর কোনো হত্যাকাণ্ডের পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেই লক্ষ্যে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ও সিসিটিভি নজরদারি বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। টিএসসি, কার্জন হল এলাকাসহ ক্যাম্পাসের নিকটবর্তী সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের মতো এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা টহল ও আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে ক্যাম্পাস এলাকা সুরক্ষিত রাখতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী অপরাধ ঘটিয়ে সটকে পড়ার সুযোগ না পায়!

লেখক: কার্যনির্বাহী সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
লিংক কপি হয়েছে!

ফোরাম ব্লাড ব্যাংক

রক্তদাতা খোঁজা হচ্ছে...

জরুরি প্রয়োজনে রক্তদাতা খুঁজুন

উপরের ফর্ম থেকে রক্তের গ্রুপ ও ঠিকানা নির্বাচন করে অনুসন্ধান করুন।