মানুষ হতে আর কত দেরি পঞ্জেরি?
‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি’। কবি গুরুর এই উক্তিটি আজও আমাদের প্রশ্নবিদ্ধ করে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পার হয়ে গেলেও আমারা কি আজও মানুষ হতে পেরেছি? আমাদের বীরত্ব দিয়ে অর্জন করেছি স্বাধীনতা। কিন্তু অর্জন করতে পেরেছি কি মনুষ্যত্ব, মানবতা আর নৈতিক গুণাবলি? বরং আমাদের নৈতিক অধঃপতন দিন দিন বেড়েই চলছে। বলতে গেলে নৈতিকতার অধঃপতন বাংলাদেশকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে। নৈতিক অধঃপতনের চিত্র বর্ণনা শুরু করলে লজ্জায় আমাদের মুখ লুকোবার জায়গা খুঁজে পাব কিনা সেটাও সন্দেহ। একদা যেখানে ধর্মীয় জ্ঞানে জ্ঞানী লোকদের দেখলে মানুষ নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করত, সেখানে যদি একজন মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ছাত্রীকে শ্লীলতাহানির অভিযোগ উঠে তবে তারচে লজ্জাজনক কথা জাতির জন্য আর কি হতে পারে?
বর্তমানে আমাদের দেশে নারীদের প্রাত্যহিক জীবন হয়ে উঠেছে বিপন্ন। ঘর থেকে বের হওয়ার পর একজন নারী তার ইজ্জত নিয়ে আবার ঘরে ফিরে আসতে পারবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদিও সে শরীয়্যাহ নির্দেশিত পর্দা পালন করুক। মানুষ নামের কতিপয় নরপিশাচদের হাত থেকে আজকাল পর্দাওয়ালা নারীরাও রক্ষা পাচ্ছে না। তার প্রধান কারণ বাংলাদেশের রাজনীতির নামে দুর্বৃত্তপনা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের (যে দলই হোক) কোনো লোক অথবা ক্ষমতাবান কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধ করে তাহলে তার শাস্তি হয় না। ঘুষের বিনিময়ে কিছুদিন চলে বিচারের নামে প্রহসন। ফলে আমাদের সমজে নারী নির্যাতন, হত্যা, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি নানা অপকর্ম দিন দিন বেড়েই চলেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ওয়ান-স্টপ সেন্টারে ধর্ষণের শিকার ও শিশুদের পক্ষে ৪ হাজার ৫৪১ টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ২২৯ টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলায় ৬০ টিতে দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি পেয়েছে। অর্থাৎ ৭৩% মামলা তখনো নিষ্পত্তিই হয়নি। এই ৭৩% মামলার আসামিরা সমাজে ঘুরে ফিরছে। শাস্তি না হওয়ার কারণে তারা ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, হত্যা ইত্যাদির মতো নানা অপকর্মকে জায়েজ করে নিয়েছে। অপরদিকে নির্যাতিতা নারী, শিশুরা পাচ্ছে না তাদের নির্যাতনের বিচার। অনেকে লোক লজ্জার ভয়ে বিচার চাইতে আসে না। অনেকে আবার বিচার চাইলে শিকার হয় আরও অমানবিক নির্যাতনের।
সম্প্রতি ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা দায়ের করায় আগুনে দগ্ধ হয়ে মরতে হলো নুসরাত জাহান রাফিকে। নুসরাত মরেনি, মরেছে ১৬ কোটি বিবেক। ফাজিল মাদরাসার একজন অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির মামলা, আবার মামলা প্রত্যাহার না করায় আগুনে পুড়িয়ে মারা, এ তো জাহেলি যুগের চেয়ে আরও বর্বর! জানা যায়, অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটা মামলা রয়েছে। আবার তিনি নাকি বিভিন্ন অভিযোগে অন্য একটি মাদরাসা থেকে সোনাগাজী মাদরাসায় বদলি হয়ে এসেছেন। এত কিছুর পরও তিনি কীভাবে অধ্যক্ষের পদে বহাল থেকেছেন? এখন তো প্রশ্ন থেকে যায়, নুসরাত হত্যার বিচার হবে কিনা। যদিও প্রধানমন্ত্রী নুসরাতের হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন, তবুও সে আশা সুদূরপরাহত। কেননা তনু হত্যার বিচার তো তিন বছরেও শেষ হয়নি। তবুও আমরা বিচারের আশা করি। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। অপরাধীর পরিচয় শুধুই অপরাধী। সে যেই হোক তাকে শাস্তি পেতই হবে। অর্ধ-পৃথিবীর বাদশাহ হযরত উমর রা. তাঁর ছেলেকে মদ্যপানের জন্য নিজ হাতে বেত্রাঘাত করেছেন। সুতরাং ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে অপরাধীকে বাচাই করতে হবে। অপরাধের শাস্তি তাকে পেতেই হবে। তবেই আমাদের সমাজ থেকে দূর হবে অপরাধ, ফিরে আসবে শান্তি। নাহলে যদি আরও তনু, রাফিকে এভাবে মরতে হয়, তাহলে আমাদের মনুষ্যত্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। ফররুখ আহমেদের সুরে সুর মিলিয়ে প্রশ্ন করতে হবে, মানুষ হতে আর কত দেরি পাঞ্জেরি?
